প্রাচীন ভারতে শক্তিশালী রাজবংশগুলির
মধ্যে অন্যতম ছিল গুপ্তবংশ। এই গুপ্ত যুগের উদারপন্থী শাসন ব্যবস্থা, সাহিত্য, শিল্পের অভাবনীয় অগ্রগতি, জনসাধারণের
স্বচ্ছলতা ও দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা লক্ষ্য করে কোন কোন ঐতিহাসিক এই যুগকে সুবর্ণযুগ
বলে অভিহিত করেছেন। বার্ণেট
নামে এক ইউরোপীয় ঐতিহাসিক গুপ্ত যুগকে প্রাচীন গ্রিসের পেরিকক্লীয় যুগের সঙ্গে
তুলনা করেছেন।
গুপ্ত
রাজা স্কন্দগুপ্তের শাসনকাল পর্যন্ত কোন বড় ধরনের বৈদেশিক আক্রমণ গুপ্তযুগে ঘটেনি। ভারতের নিরাপত্তা ও শান্তি
দীর্ঘদিন ধরে অক্ষুন্ন ছিল। স্কন্দগুপ্তের
আমলে হূন আক্রমণ ঘটলেও তিনি তা প্রতিহত করে আরো ৫০ বছর ভারতকে নিরাপদে রাখেন। গুপ্ত
শাসনের একেবারে শেষের দিকে পুনরায় হূন আক্রমণ ঘটে। দীর্ঘকাল গুপ্ত সম্রাটরা ভারতকে বৈদেশিক
আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত করে রেখেছিল।
গুপ্ত শাসন ব্যবস্থা সাম্রাজ্যের
অভ্যন্তরীণ শান্তি ও সংহতি রক্ষা দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল। মৌর্য যুগের অতি কেন্দ্রিকতা ত্যাগ করে
গুপ্ত রাজারা কেন্দ্রীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ নীতির মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপন করেন। সাম্রাজ্যের ঐক্যকে বিনষ্ট না করে
তাঁরা প্রদেশ ও জেলা স্তরে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করেন
এবং স্থানীয় প্রতিনিধি সভা গঠন করে শাসনের ব্যবস্থা
করেন। গুপ্ত
শাসন ব্যবস্থার এই দিকটি ছিল নিঃসন্দেহে প্রগতিশীল। এর ফলে সাম্রাজ্যের সংহতি দৃঢ় হয়, স্থানীয় উপজাতির স্বাতন্ত্র্য
রক্ষিত হয়, জনসাধারণ সন্তুষ্ট থাকে। ভারতের মতো একটা বিশাল দেশের পক্ষে এককেন্দ্রিক কেন্দ্রীয় শাসনের দুর্বলতা সম্পর্কে তাঁরা বিশেষ ভাবে উপলব্ধি করেছিল।
গুপ্ত শাসন ব্যবস্থার চরিত্র ছিল উদারনৈতিক। ফা-হিয়েনের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, জনসাধারণ স্বাধীন ও অবাধ ভাবে জীবন যাপন করতে পারত। গুপ্ত রাজাদের কোন গুপ্তচর বা সরকারি কর্মচারী তাদের ব্যক্তি স্বাধীনতা ও দৈনন্দিন জীবনের শান্তিকে বিঘ্নিত করতে পারত না। ফৌজদারি আইন ছিল মৃদু নিত্যান্ত বিশেষ অপরাধ ছাড়া অপরাধীদের অঙ্গচ্ছেদ করা হতো না এবং প্রাণদণ্ডের বিধান খুবই সীমাবদ্ধ ছিল। ফা-হিয়েনের বিবরণ থেকে গুপ্ত যুগকে সুবর্ণ যুগ বলার্ যথোপযুক্ত তথ্য পাওয়া যায়।
গুপ্ত
যুগের ধর্ম ব্যবস্থাও প্রশংসার দাবি রাখে। যদিও এ যুগে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের
পুনর্জাগরণ ঘটেছিল বলে মনে করা হয়। যদিও সমুদ্রগুপ্ত
অশ্বমেধ যজ্ঞ অনুষ্ঠান করেন, গুপ্ত যুগে
ব্রাহ্মণরা প্রাধান্য ভোগ করেন, তথাপি গুপ্ত
সম্রাটরা ধর্মসহিষ্ণু ছিলেন। তাঁরা অন্য ধর্মের
প্রতি বিশেষ করে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি যথোচিত উদারতা ও সাহায্য করতেন। সিংহলের রাজা মেঘবর্ণ বুদ্ধগয়া
বিহার নির্মাণ করার জন্য সমুদ্রগুপ্তের
কাছে দূত প্রেরণ করেন। তিনি অনুমতি
দেন ও এই বিহারের ব্যয় নির্বাহের জন্য কয়েকটি গ্রাম দান করেন। গুপ্ত সম্রাটরা নালন্দা
বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। গুপ্ত সম্রাটরা জৈন
ধর্মের বিশেষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা না করলেও সাধারণ লোক ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে
বিশেষত পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতে জৈনধর্ম জনপ্রিয়তা ছিল। গুপ্ত যুগে হিন্দু ধর্মের প্রাধান্য
বাড়লেও তা বৈদিক হিন্দু ধর্ম ছিল না, তা ছিল লৌকিক
ধর্ম। এক
সময়ে বৈদিক ধর্মে যাদের অনার্য বলা হত এবং লৌকিক দেবতা বলে ঘৃণা করা হত যথাঃ- শিব, কালী, কার্তিক, লক্ষী গুপ্ত
যুগে তারাই বৈদিক দেবতা ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ প্রভৃতিকে স্থানচ্যুত করে জনসাধারণের হৃদয়ে স্থান
করে নিয়েছিল। গুপ্তযুগে
বৈষ্ণব ধর্মের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। সম্রাট
দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বৈষ্ণব ধর্মের অনুরাগী ছিলেন। শৈবধর্ম গুপ্ত যুগে অগ্রগতি লাভ করেছিল। ভারবীর কিরাতার্জুনীয়ম কাব্য শিবের
জনপ্রিয়তার প্রমাণ। বায়ু ও
মৎস পুরানের শিবের প্রতি বিশেষ ভক্তি প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। গুপ্তযুগে বহু শিব মন্দির তৈরি
করা হয়েছিল। বৈদিক
যজ্ঞের ও বৈদিক দেবতা পুজোর প্রথা গুপ্তযুগে জনপ্রিয়তা হারায়।
গুপ্ত যুগের সাহিত্যের ও দর্শনের চর্চার
অগ্রগতি পরবর্তী প্রজন্মকে বিস্মিত করেছে। এযুগের সৃজনী প্রতিভা সাহিত্য দর্শন
শিল্পের ক্ষেত্রকে বিকশিত করেছে। শুধু এই
কারণে গুপ্ত যুগকে সুবর্ণ যুগের আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। প্রাচীন ভারতের কবি কালিদাস তাঁর কাব্য ও নাটক রচনা দ্বারা সংস্কৃত সাহিত্যকে
বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে প্রথম সারিতে স্থান করে দেন। ভারবি, শূদ্রক, বিশাখদত্ত প্রভৃতি সাহিত্যিক ছিলেন গুপ্তযুগের সাংস্কৃতিক
প্রতিনিধি। দর্শনশাস্ত্রে
গুপ্ত যুগের চিন্তাবিদদের মধ্যে মৌলিক চিন্তার প্রভাব
লক্ষ্য করা যায়। গৌড়পাদের
‘বেদান্ত দর্শন’, আসঙ্গের ‘নাগাচারশাস্ত্র’, ঈশ্বর কৃষ্ণের সাংখ্যকারিকদের কথা এ প্রসঙ্গে বলা যায়। অমর সিংহের কাব্যের আকারে সংস্কৃত অভিধান,
বাগভট্টের চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কিত তথ্য, বরাহ মিহিরের পঞ্চসিদ্ধান্ত, আর্যভট্টের আহ্নিক
ও বার্ষিক গতির তত্ত্ব গুপ্ত যুগের বিজ্ঞানের অগ্রগতির পরিচয় বহন করে।
শিল্প
অর্থাৎ স্থাপত্য ভাস্কর্য শিল্পকলায় গুপ্ত যুগ ছিল অসাধারণ সৃজনশীল। গুপ্ত যুগেই মন্দির স্থাপত্যের প্রথম
প্রকাশ শুরু হয়; তিন মহলা, তিন প্রস্থে মন্দির নির্মাণের
স্থাপত্যরীতির উদ্ভব হয়। অজয়গড়ের
পার্বতী মন্দির, সাতনার একলিঙ্গ মন্দির, ভিতারগাঁওয়ের ইটের তৈরি মন্দির এর উদাহরণ। গুপ্ত যুগের ভাস্কর্য গন্ধার শিল্পের স্থূলত্ব, অমরাবতী ইন্দ্রিয়তাবাদ
অতিক্রম করে এক অতীন্দ্রিয় স্তরে পৌঁছেছিল। দেবদেবীর ওষ্ঠাধরে স্মিত হাস্য হৃদয়
দিব্যজ্ঞানের উদ্ভাসের
পরিচয় দেয়, অর্ধনির্মীলিত চক্ষু প্রজ্ঞা বা বোধির
সাক্ষ্য দেয়। এ যুগে চিত্র শিল্পের উদাহরণ অজন্তার প্রাচীরের গায়ে আঁকা আছে। গুপ্ত যুগের স্বর্ণ মুদ্রাগুলির
শিল্প সুষমা ছিল চোখে পড়ার মতো। এই সকল
দিকগুলি মিলিয়ে গুপ্তযুগকে সুবর্ণ যুগ বলা হয়।
গুপ্ত
যুগকে সুবর্ণ যুগ বলা সঙ্গত কিনা তা নিয়ে দ্বিতীয় একটি ধারার সূচনা হয়েছে। গুপ্ত শাসন ব্যবস্থার প্রশংসার
দিকগুলি থাকলেও দুর্বল দিকগুলির কথা বলা দরকার। গুপ্ত সাম্রাজ্য এই দুর্বলতার জন্য
ভেঙ্গে গিয়েছিল। প্রদেশ
ও জেলায় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করার ফলে স্থানীয় শাসনকর্তারা ক্ষমতালোভী হয়ে
পড়ে। কেন্দ্রের
প্রবল দুদণ্ড প্রতাপ সম্রাট না থাকায় তাঁরা ক্রমে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। তাছাড়া বংশানুক্রমিক পদে নিয়োগে
দুর্নীতি ও বেতনের পরিবর্তে ভূমিদাস নিয়ম চালু করা হলে সামন্ত প্রথার উদ্ভব ঘটে। এই সামন্ত শ্রেণি শীঘ্রই
স্বাধীকার প্রদত্ত হয়ে সাম্রাজ্যের ঐক্য ও সংহতিকে বিনষ্ট করে ফেলে। যশোধর্মন ছিলেন এইরূপ এক
প্রভাবশালী সামন্ত রাজা। বলভীর
মৈত্রক বংশ, কনৌজের মৌখরী
বংশ ও এইরূপ সামন্ত ছিল।
গুপ্ত যুগের স্বর্ণমুদ্রাগুলি এযুগের
অর্থনৈতিক উন্নতির পরিচয় দিলেও এই আপাতঃ
সচ্ছলতার অন্তরালে ছিল জনসাধারণের অপরিসীম দারিদ্রতা। শাসকশ্রেণী সামন্ত ও অভিজাত শ্রেণী হয়তো
স্বর্ণমুদ্রা ব্যবহার করত, কিন্তু সাধারণ লোকে তাঁর
অধিকারী ছিলনা। দৈনন্দিন কেনা-বেচার জন্য দরকার ছিল রৌপমুদ্রা। গুপ্ত যুগের রৌপ্য
মুদ্রার দুর্লভতা প্রমাণ করেছে সাধারণ লোকের হাতে বেশি অর্থ ছিল না। ফা-হিয়েন
বলেছেন যে, লোকের টাকার অভাবে কড়ি দিয়ে জিনিসপত্র
কেনা বেচা করত। রৌপ্য মুদ্রার
অভাবের জন্যই সরকারি কর্মচারীদের নগদ বেতন না দিয়ে জমি দেওয়া হত।
যদিও ফা-হিয়েন গুপ্ত
যুগের সমৃদ্ধির কথা বলেছেন তবুও তিনি উল্লেখ করেছেন যে, দেশের বড় বড় শহরগুলি ধ্বংস হতে বসেছিল। পাটলিপুত্র নগরী ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়ে ছিল। এছাড়াও শ্রাবন্তী, কপিলাবস্তু, রাজগৃহ
ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। প্রাচীন
বাণিজ্যিক পথগুলির আর কোনো গুরুত্বই ছিল না। সুতরাং গুপ্ত যুগের সমৃদ্ধি উচ্চ অভিজাত
ও সামন্ত শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সাধারণ
লোকের মধ্যে তা তেমনভাবে ছিল কিনা সন্দেহ। কালিদাসের নাটকে রাজ দরবারের
যে বিলাসিতার চিত্র দেখা যায় তা দেশের সামগ্রিক সমৃদ্ধির পরিচয় দেয় না। মূলতঃ গুপ্ত যুগের সচ্ছলতা অনেক পরিমাণে সামন্ত শ্রেণীর শোষণ ও
ধনী বণিকদের অর্থ কৌলিন্যের ওপর নির্ভর করত। গুপ্ত যুগে জাতির সকল স্তরে
এই সচ্ছলতা ছড়িয়ে পড়েনি বলে অনেকে মনে করেন।
গুপ্ত যুগের সাহিত্য ও শিল্প অভিজাত
শ্রেণীর বিনোদনের জন্যই সৃষ্ট
হয়েছিল। সমাজের উচ্চ
শ্রেণীর ভাষা ছিল সংস্কৃত এবং এই ভাষাতেই সাহিত্য রচিত হত। কিন্তু সাধারণ লোকের
মুখের ভাষা প্রাকৃত ছিল অবহেলিত। নাটকের
বিষয়বস্তু ছিল প্রধানত রাজাদের যুদ্ধযাত্রা, প্রমোদ ও কৈতব। উচ্চ
শ্রেণীর লোকের বিনোদনের জন্য নাটক ও নৃত্যের পরিকল্পনা করা হয়। এই যুগে সংখ্যাগোরিষ্ঠ সাধারণ
লোকের জীবনযাত্রা নিয়ে কোন নাটক রচিত হয়নি। এমনকি সংস্কৃত নাটকগুলি ছিল মিলনাত্মক। কারণ, উচ্চ শ্রেণীর লোকের মনোরঞ্জনের জন্য তা দরকার ছিল। বিয়োগান্ত নাটক এযুগে লেখা হয়নি এ প্রসঙ্গে কোশাম্বীর মত প্রণিধানযোগ্য। কোশাম্বী
বলেন যে, গুপ্ত যুগের সমাজের উচ্চতর শ্রেণী নিম্ন
শ্রেণীর থেকে নিজেদের আলাদা রাখার জন্য সাহিত্যে
সংস্কৃত ভাষার ব্যবহার করেন। কৃষি
ভিত্তিক অর্থনীতিতে উচ্চ উৎপাদন ব্যবস্থার ফলে নতুন যে ধনিক শ্রেণীর
সৃষ্টি হয় তারা নিজেদের আভিজাত্য রক্ষার জন্য সংস্কৃত ব্যবহার করে। ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়রা প্রধানত ধর্ম ও প্রেমের
বিষয়ে আগ্রহ দেখাত। এই যুগের সাহিত্যের মতোই ভাস্কর্যেও ইন্দ্রিয় প্রবণতা অধিক দেখা যায়। গুপ্তযুগে শিল্প, ভাস্কর্যেও উচ্চশ্রেণীর লোকের রুচির প্রতি আনুগত্য দেখা যায়। সাধারণ লোকের জীবন নিয়ে কোন
মূর্তি তৈরি বা চিত্র আঁকা হয়েছে বলে জানা যায়নি। গুপ্ত সমাজে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রভাবে
জাতিভেদ প্রথা বিলোপ সাধিত হয়। সমাজে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় শ্রেণী অধিকাংশ সুবিধা ভোগ দখলের অধিকারী হয়।
এই সকল
ত্রুটি সত্ত্বেও গুপ্ত যুগের সামগ্রিক অগ্রগতি ছিল চোখে পড়ার মতো। গুপ্ত যুগের শাসনব্যবস্থায় সাহিত্য, শিল্প, ভাস্কর্যে,বৈজ্ঞানিক
কর্মকান্ডের সকল ক্ষেত্রে গুপ্তযুগের মনীষার অসাধারণ ও বহুমুখী বিকাশ
ঘটেছিল। এছাড়া প্রথম দিকের গুপ্ত সম্রাটদের
দক্ষতার দ্বারা সাম্রাজ্যের অভাবনীয় অগ্রগতি সাধন সম্ভব হয়েছিল। ক্রমবর্ধমান উন্নায়ন
প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে গুপ্ত সাম্রাজ্যে সুবর্ণ যুগের সূচনা করেছিল।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন